
বিদেশের মাটিতে রাসবিহারী বসু : ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্তর্জাতিক মুখ
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে Rash Behari Bose শুধু একজন বিপ্লবী নন, তিনি ছিলেন এমন এক দূরদর্শী সংগঠক যিনি বিদেশের মাটিতে বসে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে আন্তর্জাতিক রূপ দিয়েছিলেন। বিশেষত জাপানে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ব্রিটিশদের চোখ এড়িয়ে জাপানে পলায়ন
১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের কঠোর নজরদারি ও গ্রেফতারের সম্ভাবনার মধ্যে রাসবিহারী বসু গোপনে ভারত ত্যাগ করেন। দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলা এবং ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী কার্যকলাপের কারণে তিনি তখন ব্রিটিশ প্রশাসনের “Most Wanted” বিপ্লবীদের একজন ছিলেন।
অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে জাপানে পৌঁছান। সেই সময় জাপান ছিল এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী উদীয়মান রাষ্ট্র এবং পশ্চিমা উপনিবেশবাদের বিরোধী মনোভাব সেখানে ক্রমশ বাড়ছিল। রাসবিহারী বসু এই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন।
জাপানে নতুন জীবন
জাপানে পৌঁছানোর পর প্রথমদিকে তাঁকে ব্রিটিশ সরকারের চাপের মুখে আত্মগোপন করে থাকতে হয়। তবে ধীরে ধীরে তিনি জাপানের জাতীয়তাবাদী মহল এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সমর্থন অর্জন করেন।
তিনি জাপানি ভাষা শেখেন, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেন এবং পরে জাপানি নাগরিকত্বও গ্রহণ করেন। তিনি জাপানের সোমা পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তোশিকো সোমাকে বিবাহ করেন। এর ফলে তাঁর সামাজিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।
আন্তর্জাতিক সমর্থন গড়ে তোলা
জাপানে বসে রাসবিহারী বসু শুধু আত্মরক্ষা করেননি, বরং ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগঠিত করতে শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন এশীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী, বিপ্লবী সংগঠন এবং জাপানি জাতীয়তাবাদী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন।
তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল:
- ব্রিটিশবিরোধী আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করা,
- বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের সংগঠিত করা,
- এবং ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক আলোচনায় তুলে ধরা।
তিনি বিশ্বাস করতেন যে শুধু ভারতের অভ্যন্তরে আন্দোলন নয়, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থনও স্বাধীনতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স লীগ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসবাসকারী ভারতীয়দের একত্রিত করে রাসবিহারী বসু “ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেনডেন্স লীগ” প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে বিদেশে থাকা ভারতীয়দের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে পড়ে।
মালয়া, সিঙ্গাপুর, বার্মা, থাইল্যান্ড এবং জাপানে বসবাসকারী বহু ভারতীয় তাঁর নেতৃত্বে সংগঠিত হন। এই লীগ পরবর্তীকালে আজাদ হিন্দ আন্দোলনের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।
আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনে ভূমিকা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হাতে বহু ভারতীয় যুদ্ধবন্দী আসে, যারা ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। রাসবিহারী বসু বুঝতে পারেন যে এই সৈনিকদের সংগঠিত করে একটি স্বাধীন ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী গঠন করা সম্ভব।
তাঁর উদ্যোগে এবং Mohan Singh-এর নেতৃত্বে গঠিত হয় প্রথম “ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি” বা আজাদ হিন্দ ফৌজ।
যদিও প্রথম পর্যায়ে নানা সাংগঠনিক সমস্যা দেখা দেয়, রাসবিহারী বসু কখনও তাঁর লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি।
নেতাজিকে আহ্বান
রাসবিহারী বসু উপলব্ধি করেছিলেন যে আন্দোলনকে সর্বভারতীয় পর্যায়ে নিয়ে যেতে একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও শক্তিশালী নেতার প্রয়োজন। সেই কারণেই তিনি Subhas Chandra Bose-কে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আসার আহ্বান জানান।
নেতাজি জাপানে পৌঁছানোর পর রাসবিহারী বসু তাঁর হাতে আজাদ হিন্দ আন্দোলনের নেতৃত্ব তুলে দেন। এই সিদ্ধান্ত ছিল তাঁর অসাধারণ দূরদর্শিতার প্রমাণ।
জাপানে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রচার
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাসবিহারী বসু জাপানে ভারতীয় সংস্কৃতি ও খাদ্যকেও জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। বলা হয়, তিনি জাপানে ভারতীয় কারি সংস্কৃতির প্রসারেও ভূমিকা রাখেন। ফলে তিনি শুধু রাজনৈতিক নেতা হিসেবেই নয়, ভারত-জাপান সাংস্কৃতিক সম্পর্কের অন্যতম সেতুবন্ধন হিসেবেও পরিচিত হয়ে ওঠেন।
পরিবার ও উত্তরসূরিদের বর্তমান অবস্থান
Rash Behari Bose-এর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জাপানে আত্মগোপনের সময় তিনি সোমা পরিবারের সংস্পর্শে আসেন। এই পরিবার টোকিওর বিখ্যাত “নাকামুরায়া” বেকারি ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল।
রাসবিহারী বসু পরবর্তীকালে তোশিকো সোমাকে বিবাহ করেন। তোশিকো ছিলেন আইজো সোমা ও কোক্কো সোমার কন্যা। এই বিবাহ শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কই নয়, ভারত-জাপান সম্পর্কের এক ঐতিহাসিক বন্ধনের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।
তাঁদের দুই সন্তান ছিল — একটি পুত্র মাসাহিদে বসু এবং একটি কন্যা তেতসুকো হিগুচি (কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে নামের ভিন্ন বানানও পাওয়া যায়)। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাসবিহারী বসুর স্ত্রী তোশিকো অল্প বয়সেই মৃত্যুবরণ করেন। এরপরও তিনি জাপানে থেকেই ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের কাজ চালিয়ে যান।
বর্তমানে রাসবিহারী বসুর উত্তরসূরিদের কিছু অংশ জাপানেই বসবাস করেছেন বা দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর পরিবারের সঙ্গে জাপানের “নাকামুরায়া” প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এখনও স্মরণ করা হয়। টোকিওতে রাসবিহারী বসুর স্মৃতির সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন স্থান ও ঐতিহাসিক দলিল আজও ভারত-জাপান বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
জাপানে তাঁকে শুধু একজন ভারতীয় বিপ্লবী হিসেবেই নয়, বরং ভারত ও জাপানের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন হিসেবেও সম্মান করা হয়। তাঁর পরিবারের উত্তরসূরিরা সময়ে সময়ে ভারত-জাপান সাংস্কৃতিক সম্পর্ক সংক্রান্ত বিভিন্ন স্মারক অনুষ্ঠান ও ঐতিহাসিক আলোচনায় যুক্ত থেকেছেন বলে জানা যায়।
শেষ জীবন ও উত্তরাধিকার
দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মগোপন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে তাঁর স্বাস্থ্য ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৪৫ সালের ২১ জানুয়ারি জাপানে তাঁর মৃত্যু হয়। স্বাধীন ভারত তিনি দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন ও সংগ্রাম পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের পথকে শক্তিশালী করেছিল।
উপসংহার
বিদেশের মাটিতে বসে রাসবিহারী বসু প্রমাণ করেছিলেন যে স্বাধীনতার লড়াই শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংগ্রাম নয়, এটি আন্তর্জাতিক সমর্থন, কূটনীতি এবং সংগঠনেরও যুদ্ধ। জাপানে তাঁর কর্মকাণ্ড ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনকে নতুন দিশা দিয়েছিল এবং আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের মাধ্যমে তিনি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ে রাসবিহারী বসুর অবদান চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।
